Shaan: ভারতের অন্যতম বড় আইটি সংস্থা Tata Consultancy Services (TCS) এর নাসিক অফিসকে ঘিরে সম্প্রতি একটি বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এই ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই কর্মীদের অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত, কোম্পানির ব্যাখ্যা সব মিলিয়ে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন, তাই চূড়ান্ত সত্য সামনে আসেনি, তবে এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে, তা নিয়েই এই প্রতিবেদন।
ঘটনার শুরু হয় যখন TCS-এর নাসিক ইউনিটে কর্মরত কিছু কর্মী গুরুতর অভিযোগ তোলেন। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে যৌন হয়রানি এবং সহকর্মী বা সিনিয়রদের দ্বারা অসদাচরণ। এর পাশাপাশি কিছু কর্মী দাবি করেন যে তাদের উপর ধর্মীয় চাপ তৈরি করা হচ্ছিল, এমনকি ধর্ম পরিবর্তনের মতো বিষয়েও জোর করা হচ্ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগগুলো সামনে আসার পর মার্চ ও এপ্রিল মাসে মোট ৯টি এফআইআর দায়ের করা হয়। অভিযোগকারীদের মধ্যে ছিলেন একজন পুরুষ কর্মী এবং আটজন মহিলা কর্মী। ফলে বিষয়টি দ্রুতই বড় আকার ধারণ করে।
এই ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় উঠে আসে Nida Khan এর নাম। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাকে TCS-এর এইচআর ম্যানেজার হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছিল। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে তিনি কোম্পানির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন এবং নিয়োগ সংক্রান্ত ক্ষমতাও ছিল তার হাতে। তবে TCS এই দাবিকে সম্পূর্ণভাবে ভুল বলে জানায়।
কোম্পানির সিইও K Krithivasan স্পষ্ট করে বলেন যে, নিদা খান কোনোভাবেই এইচআর ম্যানেজার ছিলেন না এবং তিনি নিয়োগ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্তও ছিলেন না। তিনি একজন সাধারণ প্রসেস অ্যাসোসিয়েট হিসেবে কাজ করতেন, অর্থাৎ টেলিকলার হিসেবে তার দায়িত্ব ছিল। কোম্পানির মতে, তার কোনো নেতৃত্বের ভূমিকা ছিল না এবং তাকে নিয়ে যে তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার অনেকটাই ভুল।
অন্যদিকে, পুলিশ এই ঘটনাকে বেশ গুরুত্ব সহকারে দেখছে। পুলিশের পক্ষ থেকে নিদা খানকে এই ঘটনার “মাস্টারমাইন্ড” বা মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে যৌন শোষণ এবং ধর্মীয় চাপ সৃষ্টি করার মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলায় মোট আটজন অভিযুক্ত রয়েছে, তাদের মধ্যে নিদা খান অন্যতম।
তবে নিদা খানের পরিবার এই সমস্ত অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে। তার বাবার দাবি, তার মেয়ে ২০২১ সালে কোম্পানিতে যোগ দিয়েছিল এবং শুধুমাত্র একটি সাধারণ চাকরি করত। তিনি বলেন, তার মেয়ে প্রতিদিন কাজ করতে যেত এবং কারো সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি। তার কথায়, “আমার মেয়ে শুধু অফিসে যেত, লোকজনকে হ্যালো-হাই বলত, আর এখন সে অন্যায়ভাবে সমস্যায় পড়েছে।” পরিবারের মতে, তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে TCS দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে এবং একটি স্বাধীন তদন্ত শুরু করেছে। কোম্পানি জানিয়েছে, তারা পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখতে চায়। এজন্য তারা বাইরের বিশেষজ্ঞদের সাহায্য নিয়েছে। এই তদন্তে যুক্ত হয়েছে Deloitte এবং আইন সংস্থা Trilegal। এর ফলে তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কোম্পানির অভ্যন্তরীণ তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন Aarthi Subramanian। পাশাপাশি একটি ওভারসাইট কমিটি গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে রয়েছেন Keki Mistry। এই কমিটি তদন্তের ফলাফল পর্যালোচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেবে। TCS-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তারা কোনো ধরনের অভিযোগকে হালকাভাবে নিচ্ছে না এবং সত্য সামনে আনতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, এই ঘটনার পর একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে TCS নাসিক অফিসটি বন্ধ করে দিতে পারে। তবে কোম্পানির সিইও এই খবর সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে নাসিক ইউনিট আগের মতোই চালু রয়েছে এবং স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে। গ্রাহকদের পরিষেবা দেওয়াও স্বাভাবিকভাবেই চলছে। অর্থাৎ, অফিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরটি সম্পূর্ণ ভুয়া।
এই পুরো ঘটনাটি আমাদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরে। প্রথমত, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, কোনো অভিযোগ সামনে এলে তা কীভাবে সঠিকভাবে তদন্ত করা উচিত? আর তৃতীয়ত, সোশ্যাল মিডিয়া বা সংবাদমাধ্যমে যে তথ্য ছড়ায়, তার সবটাই কি সত্যি?
নাসিকের এই ঘটনা এখনো তদন্তাধীন। তাই এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। একদিকে কর্মীদের অভিযোগ, অন্যদিকে অভিযুক্তদের দাবি দুই দিকই গুরুত্ব সহকারে দেখা দরকার। তদন্ত শেষ হলে তবেই আসল সত্য সামনে আসবে।
সব মিলিয়ে, এটি একটি সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা শুধু একটি কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তরভাবে কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন তুলে দেয়। এখন সকলের নজর তদন্তের ফলাফলের দিকে, কারণ সেটাই নির্ধারণ করবে এই ঘটনার আসল দিকটা কী।

