নয়াদিল্লি: রাজধানী দিল্লি ও সংলগ্ন এনসিআর এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে আবার একবার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম পনেরো দিনের মধ্যেই প্রায় আটশোর বেশি মানুষ নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ থানায় নথিভুক্ত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় পঞ্চাশেরও বেশি নিখোঁজের রিপোর্ট, এই পরিসংখ্যানে প্রশাসনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা বাড়িয়েছে।
দিল্লি পুলিশের সূত্রে জানা গেছে, এই নিখোঁজদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও অপ্রাপ্তবয়স্ক। প্রথম দুই সপ্তাহে প্রায় পাঁচশো নারী ও কিশোরী এবং প্রায় দুই শতাধিক শিশু নিখোঁজের অভিযোগ জমা পড়েছে। সংখ্যার বিচারে এই তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। যদিও পুলিশ স্পষ্ট করেছে, প্রতিটি নিখোঁজের ঘটনার পেছনে এক ধরনের কারণ কাজ করে না।
নিখোঁজ শব্দটি ঘিরে জনমনে তৈরি হওয়া আতঙ্ক প্রসঙ্গে পুলিশ জানিয়েছে, ‘মিসিং পারসন’ বলতে সব সময় অপরাধ বা অস্বাভাবিক ঘটনার ইঙ্গিত বোঝায় না। অনেক ক্ষেত্রে পারিবারিক বিবাদ, ব্যক্তিগত সমস্যা, কাজের সন্ধানে অন্য শহরে চলে যাওয়া বা হঠাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পরিবারের তরফে থানায় অভিযোগ দায়ের করা হয়। এই ধরনের বহু ঘটনায় পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে পাওয়া যায় বা তারা নিজেরাই ফিরে আসে।
তবে এটাও অস্বীকার করা যাচ্ছে না যে, সব কেস একই রকমভাবে শেষ হয় না। পুলিশি নথি অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসের প্রথমার্ধে দায়ের হওয়া বহু অভিযোগ এখনও তদন্তাধীন। বিশেষ করে নারী ও শিশু নিখোঁজের ঘটনায় প্রশাসনের উদ্বেগ বেশি। এই ধরনের ঘটনায় সম্ভাব্য সব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন আধিকারিক জানান, নিখোঁজদের খোঁজে প্রযুক্তি নির্ভর অনুসন্ধানের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক তৎপরতা চালানো হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ, মোবাইল লোকেশন ট্র্যাকিং, রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালে নজরদারি এবং আন্তঃরাজ্য পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে তদন্ত এগোচ্ছে। অতীতের মতো এবারও বেশ কিছু ঘটনায় নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলন সম্ভব হয়েছে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দিল্লি এনসিআরের সামাজিক বাস্তবতাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অন্যতম বৃহৎ মহানগর হওয়ায় দিল্লিতে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষ কাজ, পড়াশোনা ও চিকিৎসার জন্য আসেন। অভিবাসী মানুষের এই প্রবাহের ফলে অনেক সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটে। ফলে নিখোঁজের পরিসংখ্যান তুলনামূলকভাবে বেশি দেখায়।
তবে নারী ও শিশু নিখোঁজের সংখ্যা যে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, সে বিষয়ে একমত অধিকাংশ সমাজ বিশ্লেষক। তাঁদের মতে, শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সামাজিক সুরক্ষা এবং সচেতনতার ঘাটতি এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। কিছু ক্ষেত্রে মানব পাচার বা অপরাধচক্রের যোগ থাকার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, যদিও পুলিশ জানিয়েছে সব কেসে এমন প্রমাণ মেলে না।
এদিকে নিখোঁজের সংখ্যা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া নানা দাবি ও মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। ‘লোক গায়েব হয়ে যাচ্ছে’ এই ধরনের বক্তব্য ঘিরে অনেকেই রহস্য বা অজানা ঘটনার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করে জানানো হয়েছে, নিখোঁজের ঘটনাগুলি কোনও অতিপ্রাকৃত বা অস্বাভাবিক ঘটনার ফল নয়। সব অভিযোগই নিয়ম মেনে নথিভুক্ত করা হচ্ছে এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী তদন্ত চলছে।
দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “নিখোঁজ মানেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া নয়। বহু ক্ষেত্রে আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে পাই বা তারা নিজেরাই ফিরে আসে। কিন্তু প্রতিটি অভিযোগকেই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।” তাঁর কথায়, সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত না হয়ে তথ্যভিত্তিক সংবাদে ভরসা করা উচিত।
উল্লেখযোগ্য যে, নিখোঁজের সমস্যা নতুন নয়। পুলিশের পুরনো নথি অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে দিল্লিতে হাজার হাজার নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তার মধ্যে অনেক কেসে সমাধান এলেও এখনও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মামলা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। এই বাস্তবতা প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের কাছেও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র পুলিশের উপর দায় চাপালে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ এবং প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় জরুরি। একই সঙ্গে তথ্যের দায়িত্বশীল ব্যবহার এবং গুজব এড়িয়ে চলাও প্রয়োজন। কারণ অতিরঞ্জিত বা ভয়ের বার্তা বাস্তব সমস্যার সমাধানের বদলে আরও বিভ্রান্তি তৈরি করে।
দিল্লি এনসিআর এলাকায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি একদিকে যেমন প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ, তেমনই অন্যদিকে সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ এনে দিয়েছে। পরিস্থিতি গুরুতর হলেও রহস্য বা আতঙ্কের বদলে তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং সচেতন উদ্যোগই যে সবচেয়ে প্রয়োজন, সে কথা মানছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

